জাতির মেরুদণ্ডে লাথি মারলা!

কাজী শাহরিয়ার । । সাংবাদিক

জাতির মেরুদণ্ডে লাথিটা মারলা। ঘুষি খেয়ে সফেদ পাগড়িটা পড়ে গেলো। তিনি কিছুই বললেন না৷ এগুতে চাইলেন। আবার মারলা। বেশ..

আমিও বাংলায় অ আ শেখা মানুষ। হয়তো আমিও কোন কলেজের বাংলার প্রভাষক হতাম। নকল করতে দেখলে পাগড়িওয়ালা বাংলা প্রভাষকের মত করতাম না আমি। কান ধরে ক্লাস থেকে বের করে দিতেম। আমার মেরুদণ্ডে লাথি পড়ার আগে তোমার মত ছেলের মেরুদণ্ড স্থির ডিগ্রিতে সোজা থাকতো না। মুচড়ে যেত

শিক্ষক পিটিয়ে মানুষ হয়েছে এমন কাউকে দেখিনি আজো। অমানুষও হতে পারেনি। জানোয়ার হয়েছে অনেকগুলো। সেই জানোয়ারের যেসব ছানা হয়, সেগুলো বাপ পেটায়। মাশাল্লাহ…

বাপ মায় জন্ম দিতে পারে শুধু। মানুষ বানায় শিক্ষকরাই..

একজন ট্রাক হেলপার কখনো ওস্তাদ ড্রাইভার পিটিয়েছে? রাজ মিস্ত্রি তার ওস্তাদ পেটায়? একজন ওয়ার্কশপ মিস্ত্রী কোনদিন তার ওস্তাদ কে ডিনাই করে না, একজন কাঠ মিস্ত্রি কোন দিন তার ওস্তাদের পেন্সিল নেয়না, একজন গান শেখা ছেলে তার ওস্তাদের নাম নিতে কানে হাত দিয়ে উচ্চারণ করে-আর একজন শিক্ষক তার হাতে গড়া ছাত্রের লাথি খায় সোজা মেরুদণ্ডে! সেলুকাস… আহারে শিক্ষা ব্যবস্থা..

কাল একটা ভিডিও ক্লিপ্স দেখলাম, শিক্ষকের ফেয়ার ওয়েলে ছাত্ররা সেকি কান্না। বান্দরবানের এক ইয়াং শিক্ষক বদলি হয়ে আসছিল, চাকমা মেয়ে গুলোর চিৎকার আর প্রাণে সয় না৷

আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা যে পথে যায় আমরা সে পথে এখনো চোখ মেলেও দেখিনা। মাইলের পর মাইল সাইকেল থেকে নেমে স্যারদের পেছনে পেছনে হেঁটেছি আমরা। স্যারদের সালাম দিয়ে ধানের ক্ষেত দিয়ে বাড়ি ফিরেছি। একদিন স্কুলে না গেলে, স্যার দেখলে পালিয়েছে প্রাণ হাতে নিয়ে।

সেদিন আমার এক হাই স্কুল শিক্ষক প্রায় কেঁদে ফেললেন- ‘বাবা তোদের পড়িয়ে যে মজা পেয়েছি, এখন কি সেটা আছে আর?’

সেদিন বিদায় অনুষ্ঠানে যাননি কেন জানতে চাইলে আমার স্কুলের অবসর নেয়া বাংলা স্যার মাথা নিচু করে কান্না লুকালেন। স্কুলের বই বিতরণ করতে দেখলাম সাবেক সুপারি চোরকে-যে চুরির দায়ে প্রচুর মার খেয়েছিল! স্কুলের হেড মাস্টারকে দেখলাম দাঁড়িয়ে থাকতে-বিশিষ্ট ছাত্র নেতারা বসে আছে তাদের বাপের চেয়ারে… আহারে পলিটিক্স! হেড মাস্টার বললেন, ‘বাবা আমি নিরুপায়’!

আমরা শিক্ষকদের সামনে চেয়ারে বসিনি কোনদিন। পায়ের কাছে লুটিয়ে ছিলাম। পাছে বেয়াদবি হয়ে যায়। দুদুল চাপা দে ম্যামকে ৫ কিলো পথ এগিয়ে দিয়ে আসতাম। ম্যাম আমাদের হাতে চকলেট দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আবেগে চোখে পানি চলে আসতো।

আমার ধর্মীয় শিক্ষক হাসান নূর স্যার আমাকে পিটিয়ে মাটিয়ে শোয়ায়ে দিয়েছিলেন। বেয়াদবি হবে এই ভেবে মাথা তুলে স্যারের দিকে তাকাইনি। স্যার এখনো দেখলে জিজ্ঞেস করেন, কিজন্য মাইদ্দিসিলাম মোনে আছে?’ -আমি লজ্জা পেয়ে যাই, ‘জ্বি স্যার’।

আমাদের মঈনকে আজগর স্যার বেত মেরে রক্ত বের করে দিয়েছিলেন। পরে দশ টাকা দিয়ে বলেছিলেন, ”যা বাজার থেকে ঘইষ্যা কিনে খাইস…” মঈনের চোর মার্কা হাসিটা এখনো মনে আছে।

শিক্ষক পেটানোর এই কালচার দেখে সোনালী দিনের কথাই শুধু ভাবি। আহারে আমাদের শৈশব। শিক্ষক লাঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক..

লেখক : সম্পাদক, প্রিয় বাঁশখালী, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম

Comments