মুসলিম উম্মাহর পুনঃজাগরণের ময়দান চরমোনাইর মাহফিল

কামরুল হাসান

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইসলামি সম্মেলন চরমোনাইর ফাল্গুন মাহফিল শেষ হয়েছে। প্রতক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে এবার মাহফিলে আগত মুসল্লিদের সংখ্যা অন্যান্য বারের তুলনায় একটু বেশি মনে হয়েছে। দেশের এই দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম জমায়েতে ধর্মপ্রাণ মানুষের আগমণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অন্যান্য বারের মতো এবারও ইন্ডিয়ার দেওবন্দ থেকে বেশ কজন গুরুত্বপূর্ণ আলেম এসেছেন, বয়ান করেছেন। পীর সাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম ৫টি ও পীর কামেল মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমের ২টি সহ মোট সাতটি বয়ান ছাড়াও দেশবরেণ্য আলেমগণ গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করেছেন।

ওলামা সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও শ্রমিক সম্মেলনসহ অনেকগুলো আলাদা আলাদা সম্মেলন হয়েছে।দেশ বিদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ মনে করেন, চরমোনাই মাহফিল বাংলাদেশের জন্য এক বড় নেয়ামত। মুসলিম উম্মাহর জাগরণের জন্য এই মাহফিলের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বিষয়ে লেখার শুরুতে গৌরবময় মুসলিম শাসনের পতন ইতিহাস থেকে কিছু আলোচনা সংঙ্গত হবে বলে মনে করি।

মানবজাতির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ সা. এর আগমন। আরেকটি অভূতপূর্ব ঘটনা হলো, কয়েকটি পাড়ামহল্লা নিয়ে তৎকালীন দুই প্রতাপশালী রাষ্ট্র রোম ও পারস্য সম্রাজ্যের মাঝখানে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর নেতৃত্বে এবং প্রথম লিখিত সংবিধান মদিনা সনদের আলোকে রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। এবং অল্পকিছুদিনের ব্যাবধানে রাসুলুল্লাহর আধ্যাতিক ও রাজনৈতিক ডাইনামিক নেতৃত্বে, খেলাফতের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে উপরোক্ত দুই সম্রাজ্যের প্রভাব খর্ব করে অগুরুত্বপূর্ণ মুসলিম জাতীটি অপরাজেয় ও সবদিক দিয়ে সর্বত্তম জাতীতে পরিণত হয়েছিলো।

রাসূলুল্লাহর পরলোক গমণের পূর্বে তৎকালীন সুপার পাওয়ার এই রাষ্ট্রটির আয়তন হয়েছিলো প্রায় ২০ লক্ষ্য বর্গকিলোমিটার। উনি এমন এক আলোকিত উম্মাহ সৃষ্টি করেছিলেন এবং চৌকস কর্মীবাহিনী গঠন করেছিলেন; যারা পৃথিবীর ধারাপাত পাল্টে দিয়েছিলো। ঝড়ের গতিতে ইসলামি রাষ্ট্রের আয়তন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি এবং ইসলামের সুমহান দাওয়াত ৫টি উপমহাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছিলো।

শুধুমাত্র খোলাফায়ে রাশিদিনের একজন উমর রা. এর সময়ই অর্ধপৃথিবী শাসন করেছিলো মুসলিমরা। পৃথিবীতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এবং মানবতা ও সভ্যতা বিনাশী তৎপরতা বন্ধে যাবতীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো।ইসলামি রাষ্ট্রের ঊষালগ্ন থেকেই মানবতা বিধ্বংসী কুফ্ফার, মুনাফিক ও মুশরিকরা ষড়যন্ত্র করে আসছিলো আলোকিত এই ব্যাবস্থার পতন ঘটাতে।

অবশেষে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের একনিষ্ঠ সেবাদাস এইযুগের আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর উত্তরসূরি আরবের হুসেইন বিন আলী, তুরষ্কের পাশা, কামাল আতাতুর্ক এবং পাকভারত উপমহাদেশের মীর জাফরদের মাধ্যমে তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবে রুপ নেয়।

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তারা ইসলামি খেলাফত ধ্বংসের যে ষ্ট্রাটেজি নিয়েছিলো তা হলো
  • ) হুসেইন বিন আলী এর মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়া।
  • ) ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যেপ্রাচ্যের বিষফোড়া ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া।
  • ) সাইক পিকোট চুক্তির মাধ্যমে খিলাফতের ভূমিকে ব্রিটিশ ফরাসিদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারার চুক্তি করা। যেমন, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সিরিয়া, লেবানন দক্ষিণ তুরস্ক ছিলো উসমানী খেলাফতের একটি বিশাল বহুজাতিক রাষ্ট্র। যার রাজধানী ছিলো ইস্তাম্বুল। খিলাফতের পতনের পর এক উম্মাহ খন্ড বিখণ্ড হয়ে প্রায় ৫০টির অধিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যাদের মানচিত্র পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত আলাদা।

১৯২৪ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লর্ড কার্জন সদম্ভে ঘোষণাকরেছিলেন, ‘বাস্তবতা এমন যে, তুরস্ক আজ মৃত। আর কখনো সে বিশ্বশক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কারন আমরা তার নৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছি। আর তার নৈতিক শক্তি ছিলো খেলাফত ব্যবস্থাও ইসলাম।

খিলাফতের পতনের ফলে মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবস্থার শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ফলে মুসলিমদের ভূমি সমূহ উপনিবেশিক শাসনের যাতাকলে নিষ্পেশিত হয় । আর পাক ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমন হয় সেই মুহাম্মদ সা. এর সময়কালেই। কিন্তু ইসলামি শাসনের বীজবপিত হয় উমাইয়া খেলাফতের সময়।

৭১২ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে হিন্দু রাজা দাহিরকর্তৃক যখন কিছু মুসলমান নির্যাতিত হয়েছিলেন সেই সময়ের উমাইয়া খলিফা ২য় আব্দুল মালেকের নির্দেশে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সূদূর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে উনার জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিম কে পাঠিয়েছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম যে শুধু পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের কিছুসংখ্যক মুসলমান কে উদ্ধার করেছিলেন তা নয়, বরং সিন্ধু প্রদেশের নিম্ন বর্ণের হিন্দু মেয়েদেরকে ব্রাক্ষণদের লালসার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। (তথ্যসূত্রঃ আল বেরুনী)

এভাবেই এই অঞ্চলে ইসলামি শাসনের অভিষেক ঘটে। ১৫৯০ এর দশকে মুঘল সম্রাট আকবরের অধীনে মুসলিম শাসকগণ শক্তভাবে ভারতবর্ষের প্রায় সম্পূর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে (১৬৫৮-১৭০৭) ভারতের মুসলিম নিয়ন্ত্রণ আরো কিছুটা সম্প্রসারীত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাড়াটিয়া বাহিনীর হাতে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ভারতে ইসলামি শাসনের সমাপ্তি সূচনা করে।

১৭৯৯ সালে সর্বশেষ স্বাধীন মুসলিম শাসক মহীশূরের টিপু সুলতানের ইংরেজদের হাতে পরাজয় কার্যকরভাবে ভারতে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি টানে। এই ক্ষেত্রেও ধুরন্ধর ইংরেজরা তাদের স্বভাবসূলভ যে কূটকৌশল অবলম্বন করে তা হলো-

১) ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ এই নীতির আলোকে মুসলিম শাসনের অধীনে শান্তি ও সমৃদ্ধিতে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদেরকে উস্কে সাম্প্রদায়িক বিভক্তি সৃষ্টি করে।

২) বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, স্বরুপচাঁদ, ঘসেটি বেগম, উর্মিচাঁদ, দূর্লভ রায়, রাজা রাজবল্লভের মাধ্যমে মীর জাফরকে নবাবের মসনদে বসানোর ষড়যন্ত্র হয় এবং সেমতে ১৭৫৭ সালের ৫ই জুন মীর জাফরের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়। যার ফসল ২৩ই জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হন।

এরপর প্রায় দুইশবৎসর ব্রিটিশ রাজের অধীনে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকতে হয় অমাদের। শ্বেতাঙ্গবাদী সুচতুর ব্রিটিশ বেনিয়াদের ১৯৪৭ সালে এই দেশ থেকে খেদানোর পূর্বে তারা এমন সব নীতি/আদর্শের মধ্যে আমাদেরকে চলতে বাধ্য করে যার ফলে বিত্তবান ও মধ্যবিত্ত এমন একটি উচ্চ শিক্ষিত ম্রেণী তৈরি হয়; যারা রক্তে মাংসে ভারতীয়/বাংলাদেশি কিন্তু চিন্তা চেতনায় ব্রিটিশ।

তৎকালীন সময়ে সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বেবিংটন ম্যাকলে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ভারত উপমহাদেশকে শক্তহাতে দীর্ঘস্থায়ী শাসন করতে হলে এখানে এমন একটি মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষিত শ্রেণী গড়ে তুলতে হবে, যারা হবে রক্তে মাংসে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা চেতনায় সম্পূর্ণ ব্রিটিশ। লর্ড কার্জন লর্ড বেবিংটন ম্যাকলের কথাতেই সুস্পষ্টভাবে তাদের হীন উদ্দেশ্য ফুটে ওঠে।

মুসলিমদের নৈতিক শক্তি (ইসলামের পূর্ণাঙ্গরুপ ও খেলাফত ) ধ্বংস করা ও মুসলিমদের উপরতাদের মতবাদ/মতাদর্শ এবং তাদের উদ্ভাবিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে একদল সেবাদাস তৈরী করাই তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিলো। খিলাফতবিহীন মুসলিম বিশ্বের দিকে একটু চোখ মেলে তাকালেই এর প্রমান পাওয়া যাবে। মুসলিম দুনিয়ায় জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকা শাসকবর্গ মূলতসম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের একনিষ্ঠ সেবক ও প্রভূদের মনোরঞ্জনকারী ছাড়া আর কিছুই নয়। এরা কেউ ধর্মব্যাবসায়ী, স্বৈরশাসক, ফ্যাসিস্ট, রাজতন্ত্রী, একনায়কতন্ত্রী, ইত্যাদি।

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে- উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে সংকীর্ণ পরিসরে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ অবস্থিত। যার পূর্বে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম দক্ষিণএশিয়া। বাংলাদেশ এশিয়ার এই দুই উপমহাদেশের জন্য সেতুবন্ধন স্বরুপ এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণসংগঠন SAARC ও ASEAN ভূক্ত দেশসমূহের মধ্যে অবস্থিত। এই কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকরাজনীতিতে কৌশলগত অবস্থানের দিক দিয়ে খুবই গুর্রুত্বপূর্ণ এ দেশের কর্তৃত্ব নিতে মরিয়া ছিলো পূর্বও পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী।

এজন্য ঐতিহাসিকভাবে আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের নাগপাশে আবদ্ধ ছিলাম। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন এশিয়া মহাদেশ রাজনীতির ‘ভরকেন্দ্রে’ পরিণত হচ্ছে তখন বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণহয়ে উঠেছে। তাই কমিউনিস্ট চীন, আধিপত্যবাদী মুশরিক ভারত, শ্বেতাঙ্গ জায়নবাদী ও ব্রিটিশ আমেরিকার শ্যেনদৃষ্টি এখন বাংলাদেশের উপর। তাদের মাথাব্যথা নেই বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পার্টি নিয়ে। কারণ এরা ক্ষমতা পাগল ভৃত্য। তাদের একমাত্র ভয় এই দেশে ইসলামের উত্থান নিয়ে। কারণ, একমাত্র ইসলামই বহুধাবিভক্ত এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এর প্রতি ইঞ্চি জমিকে সুরক্ষা দিতে পারে ।

বাংলাদেশের ইসলামিক লিডার হবে ডাইনামিক। তার সুদক্ষ নেতৃত্বে সব দিক দিয়ে একটি উন্নত জাতী এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেই ইসলামের উত্থান বিলম্বিত করার জন্য তারা তাদের দাতা সংস্থা, দূতাবাস এবং এদেশিয় এজেন্টদের ব্যাবহার করছে। আলেম ওলামা পীর মাশায়েখদের মধ্যে বিভক্তি ও ইসলামি দলসমূহ খন্ড-বিখন্ড করে রাখার সব কৌশল তারা প্রয়োগ করেছে। বিপুল অর্থের বিনিয়োগ করছে মিডিয়ার পিছনে। যাতে সত্যিকার মুসলিমদের ‘কমসভ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

বিকৃত সুফিজম জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হয়। যাতে করে শীর্ক বেদাতে আচ্ছন্ন মুসলিম যুবকদের অন্তর থেকে ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তা মুছে ফেলা যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপিড়নের শিকার বাংলাদেশের বর্তমান মুসলিমদের মন নির্মোহ ভাবে বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার বোঝা যাবে ষড়যন্ত্রকারীদের চিন্তা চেতনা।

  • নিম্নোক্ত প্রভাবকগুলো দ্বারা প্রভাবিত করা হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠির মন-মনন-
  • ১) হিন্দু সংস্কৃতি।
  • ২) ঔপনিবেশিক দাসত্ব।
  • ৩) পুঁথি সাহিত্যের ভাবাবেগ ও বিকৃত সুফিবাদ।
  • ৪) ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংযোজিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।

যার ফলে এই জাতির নিকট ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ এখন অপরিচিত ও দূর্বোধ্য। একজন ব্যাক্তি নামাজে ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া ইয়্যাকানাস তা’য়ীন (আমরা তোমারি ইবাদত করি এবংতোমার নিকট সাহায্য চাই) বলে, কিন্তু রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে। একজন ব্যাক্তির দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী ঠিকই আছে; কিন্তু রাসুলুল্লাহর আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পরিবর্তে সে মুজিব, জিয়া, কার্ল মার্কস বা লেলিনদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা জন্য সংগ্রাম করে।

ইসলামের প্রকৃতরুপ হলো আল্লাহ ও রাসূলের উপর আমৃত্যু সন্দেহাতীত বিশ্বাস করা। জীবন ও সম্পদ দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। আন্তর্জাতিকভাবে পরাশক্তি করার জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

খিলাফতের অবসানের পর বিশ্বব্যাপী এই উম্মাহর একনিষ্ঠ সন্তানরা চেষ্টা করছে এই উম্মাহর মধ্যে পুনঃজাগরণ ঘটাতে। মানুষের সম্মান ও খেলাফত ব্যবস্থা পুনরায় নিয়ে আসতে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, শহীদ ড. আব্দুল্লাহ আজ্জাম, আমেরিকার প্রোকৌশলি শহীদ আনওয়ার আওলাকির, সাইদ নুরসী তুরস্ক, মিশরের শহীদ হাসানুল বান্নাহ রহ, শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব রহ, ফিলিস্তিনের তাকি উদ্দিন নাবহানী রহ এবং পাকভারত উপমহাদেশে সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদনী রহ. সাইয়েদ আহমাদ শহীদ রহ. শাহ ইসমাইল শহীদ রহ. বাংলাদেশে মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর রহ ও তাঁর প্রিয় ছাত্র সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. (পীর সাহেব চরমোনাই)। এদের প্রত্যেকেই একটা একটা বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন।

আমরা দেখবো সৈয়দ ফজলুল করীম রহ এর পীর মুরিদীর মধ্যে রাসুলুল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি খুঁজে পাওয়া যায় কিনা-

১) তালীম তারবিয়াত (জ্ঞাণার্জন ও প্রশিক্ষণ)। ২) তাযকিয়া (আত্নশুদ্ধি)। ৩) তাবলীগ (দাওয়াত)। ৪) জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। তিনি এই চারটি কর্মসূচির মাধ্যমে পীরের নামে ভন্ডামি, ধর্মব্যাবসা এবং ইসলামের নামে সুবিধাবাদী রাজনীতি কঠিন করে ফেলেছেন। তিনি আধ্যাত্মিক ও প্রচলিত ইসলামি রাজনীতির মধ্যে যে যুগান্তকারী সংস্কার নিয়ে এসেছেন সত্যনিষ্ঠ মানুষরা একদিন না একদিন শ্রদ্ধাভরে তা স্মরণ করবে।

  • আমি একবার ইটালিয়ান সাংবাদিক, গবেষক, ইটালির ইসলামি সংগঠন UCOII মুসলিম নেটওয়ার্ক ইউরোপের মুখপাত্র নওমুসলিম হামজা রবের্তো পিকার্দো এর সাথে উপরোক্ত কর্মসূচি সমূহ নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, এগুলিই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের কর্মসূচি। হামজা পিকার্দো ইটালিয়ান ভাষায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ কুরআন অনুবাদ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ কুরআন অনুবাদ বিষয়ে প্রায় আধাঘন্টার একটি ডকুমেন্টারি করেছে সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা। পাঠকদের কারো কৌতুহল জন্মালে ইউটিউবে ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন।

পীর সাহেব চরমোনাই রহ সুপরিকল্পিত ৪টি কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন রাসুলুল্লাহর গ্লোবাল মিশনকর্মসূচির নকশা সামনে রেখে। এগুলো হল

১) বাংলাদেশ কুরান শিক্ষাবোর্ড গঠন করেছেন তালিম তারবীয়াতের জন্য।

২) বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি (বামুক) গঠন করেছেন আত্নশুদ্বী ও আত্নগঠনের জন্য।

৩) ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ও এর অন্যান্য অংগসংগঠন করেছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠাএবং আন্তর্জাতিকভাবে খিলাফতের ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

৪) উপরোক্ত সমস্ত সংগঠন সমূহ একযোগে দাওয়াতের কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য।

বামুকের তত্ত্বাবধানে প্রতি বৎসর অঘ্রায়ণ ও ফাল্গুনে আত্নশুদ্ধী ও আত্নগঠনসহ সবগুলো কর্মসূচির সমন্বয় সাধনের জন্য চরমোনাই মাদরাসায় মহামিলনের আয়োজন করা হয়। বিশালতার দিক দিয়েএটিকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মাহফিল বলা হয়। কিন্তু মানগত দিক থেকে আমি বলব এটি মুসলিম উম্মাহর পুনঃজাগরণের ময়দান। কারণ এইখানে পূর্ণাঙ্গ দীনের ৪টি কর্মসূচির স্রোতধারা এসে মিলিত হয় মুসলিম জাতিকে শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে।

শায়েখদের সমকাল ও আত্মশুদ্ধীরএবং ভ্রাতৃত্ববোধের উপর কুরান সুন্নাহ বিজ্ঞাণ ও যুক্তির আলোকে ৭টি বয়ান, ওলামা ও বুদ্ধিজীবীসমাবেশ, ছাত্র, যুব ও শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরস্পরের সাথে মত ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, তথ্যবিনিময়, সারা দেশের মাঠপর্যায়ে সমস্যা সমূহ নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। যা উম্মাহর পুনঃজাগরণেজন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

  • চরমোনাই মাহফিল নিয়ে আমার কিছু পরামর্শ:

১) মাহফিলে শায়েখদের ৭টি বয়ানের মধ্যে অন্তত একটি যেন তাওহীদ ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নিয়ে হয়।

২) ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সমূহ যারা ম্যানেজমেন্ট করেতাদের সহযোগিতায় মাহফিলের সুন্দর্য আন্তর্জাতিক মানের করা।

৩) ইউরোপ ও আমেরিকার ইসলামিক স্কলারদের আমন্ত্রণ করা।

৪) মধ্যেপ্রাচ্যসহ পাক-ভারত উপমহাদেশের সকল ইসলামি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে চরমোনাই মাহফিলের সচিত্র প্রতিবেদন (তাদের ভাষায়) পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

৫) প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও সোস্যাল মিড়িয়াতে সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রচারের ব্যাবস্থা করা।

৬) আগত লক্ষ লক্ষ জনতাকে সমকালের উত্তীর্ণ করে কার্যকর ও স্বপ্রোনোদিত জনশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে বক্তা ও বিষয় নির্বাচন করা। বিশ্ব মানের প্রেজেন্টেশন (উপস্থাপনা, বিজ্ঞাণ ,যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ) করা।

লেখক: কলামিস্ট, ইঞ্জিনিয়ার, (ইতালি প্রবাসী)

/এসএস/একুশ/মুক্তমত

Comments