সংবিধান লঙ্ঘনের নির্বাচন ও ১৮তম সংশোধনীর প্রস্তাবনা

প্রকাশিত: ৫:৩৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৩

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ, কারো দান, দক্ষিণা বা উপহার নয়। রাষ্ট্র এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একাদশ সংসদের শেষ অধিবেশনও চলছে। এই অধিবেশনেই নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যসমূহ পূরণকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান-এর কতিপয় বিধানের অধিকতর সংশোধন সমীচীন ও প্রয়োজন।

সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক চেতনার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, চরম সাংঘর্ষিক এবং বিরোধপূর্ণ হওয়ার পরও রাষ্ট্রের আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ – কেউই আজ পর্যন্ত সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

মূল প্রসঙ্গটি হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। আমাদের সংবিধানে ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; তবে শর্ত থাকে যে এই দফার (ক) উপ দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।

১২৩ (৩) ‘ক’ নিরঙ্কুশ নয় শর্ত যুক্ত অনুচ্ছেদ।

শর্তটা হচ্ছে- মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যগণ শপথ নিতে পারবেন না। এই শর্ত লঙ্ঘন করলেই সংসদ নির্বাচন অবৈধ হয়ে পড়বে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে উপরোক্ত অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হওয়ার পর দশম এবং একাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত দশম এবং একাদশ দু’টি সংসদই শর্তকে লঙ্ঘন করেছে। পূর্ববর্তী সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্বেই শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করেছে। সংসদ সদস্যগণের শপথ ও কার্যভার গ্রহণ করার পর প্রজাতন্ত্রের সরকার গঠন করা হয়েছে।

এতে এক সংসদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আরেক সংসদ গঠন এবং সরকার গঠন স্বভাবতই অসাংবিধানিক ও আইন বহির্ভূত হয়ে যায়। নির্বাচন হলেই সংবিধান লঙ্ঘন হচ্ছে কিন্তু এর কারণ অনুসন্ধান করে সংশোধন করা হচ্ছে না।

একদিকে মেয়াদ সমাপ্তির আগে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করিবেন না বলা হয়েছে, অন্যদিকে সংবিধানের ১৪৮( ২/ক) তে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিতে বাধ্যতামূলক করেছে। এই সব চরম সাংঘর্ষিক অনুচ্ছেদ পরস্পর বিদ্যমান থাকায় সংবিধান লঙ্ঘনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

সংসদের মেয়াদ কেউ সংক্ষিপ্ত করতে পারবে না। না সরকার, না আদালত। দুই কারণে সংসদের মেয়াদ শেষ হতে পারে। ১. রাষ্ট্রপতি ভাঙ্গিয়া দিলে এবং ২. মেয়াদের অবসান হলে। কিন্তু দশম এবং একাদশ সংসদ রাষ্ট্রপতি ভাঙ্গিয়া দেন নাই এবং মেয়াদের অবসানও ঘটেনি। এতে বিনা কারণে এবং সহজে সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। ধারাবাহিকভাবে সংবিধানের লঙ্ঘন কোনো ক্রমেই অনুসরণীয় হতে পারে না। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন ও শপথ নেওয়ার অভিযোগে একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২৯০ জন সংসদ সদস্যের শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জের রিট খারিজের বিরুদ্ধে করা লিভ-টু আপিল খারিজ হয়েছে। ১ আগস্ট, ২০২৩ প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই আদেশ দেন। গুরুতর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটির সাথে সংসদের মেয়াদ, দু’টি সংসদের একই সময় অবস্থান, সংসদ সদস্যদের শপথ ও সরকারের বৈধতা জড়িত সে বিষয়টির কোনো সাংবিধানিক ব্যাখ্যা না দিয়ে সংবিধানের রক্ষক হয়েও আদালত রিট খারিজ করেছে অথচ আপিল গ্রহণ করার প্রভূত ক্ষমতা সুপ্রীম কোর্টকে ন্যস্ত করেছে আমাদের সংবিধান।

সংসদ সদস্যের শপথ সংক্রান্ত রিটে রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা সংবিধান বহির্ভূত অভাবনীয় বক্তব্য উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, একাদশ সংসদের সংসদ সদস্যগণ ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ শপথ গ্রহণ করলেও, তা কার্যকর হবে না, তা কার্যকর হবে ৩০ জানুয়ারি, সংসদ অধিবেশন বসার দিন থেকে। কিন্তু আমাদের সংবিধান ১৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের অধীন, যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক সেই ক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যাহতি পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে। আইন কর্মকর্তা বিবেচনাই করেননি শপথ গ্রহণ করে ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য সবাই ব্যক্তি হিসেবে শপথ নেন।

বঙ্গভবন, গণভবন এবং সংসদ ভবন শপথের আওতাভুক্ত নয়। সংবিধান বলেছে- যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক সেখানে সংসদ অধিবেশনের সাথে কী সম্পর্ক? প্রজাতন্ত্রের আইন কর্মকর্তার বক্তব্য সংবিধানকে চরম সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। যেমন, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ না করলে, কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘সরকার’ গঠিত হবে? সংসদ সদস্য হওয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই। আর এক সংসদের মেয়াদ অব্যাহত থাকা অবস্থায়, পরবর্তী সরকার গঠিত হতে পারে না। সংসদের মেয়াদ শেষ হলেই প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। মেয়াদ থাকা অবস্থায় এবং পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রীপদ শূন্য হয় না, পদ শূন্য না হলে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া যায় না।

মাত্র কিছুদিন পূর্বে আমাদের রাষ্টপতি নির্বাচিত হওয়ার পর অনেকদিন অপেক্ষমান থাকতে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের মেয়াদ অবসান শেষে নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নিয়েছেন।

রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি, নির্বাচিত হয়েও শপথ নিতে অপেক্ষমান থাকবেন আর সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হয়ে আরেক সংসদের মেয়াদ থাকা অবস্থায় তিন দিনের মধ্যে শপথ নিবেন এটা কোন বিবেচনায়ই যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। শপথ প্রশ্নে একই দেশে দু’টি আইন চলমান থাকতে পারে না। পৃথিবীর সকল দেশে, সংসদ বা রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অবসান ব্যতীত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে কেউ শপথ নেয় না বা নিতে পারে না, শুধু বাংলাদেশ ছাড়া।

ধরা যাক, আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনের পর যদি বিরোধীদল বিজয়ী হয়ে দ্রুতগতিতে ‘সরকার’ গঠন করে আর বিদ্যমান সরকার একাদশ সংসদের মেয়াদ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও সংঘাত সৃষ্টি হবে এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়বে।

সংবিধানের ১২৩ (৩) ক অনুচ্ছেদের কারণে নির্বাচনে সকল প্রার্থীর সমতা বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয় না, নায্যতাও নিশ্চিত হয় না। আমাদের সংবিধান সকলে মিলে সমান মৌলিক অধিকার (Liberty) ভোগ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে, এটাই আমাদের সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। সংসদ নির্বাচনে যাতে সকল প্রার্থী সমান সুযোগ লাভ করতে পারে, কারো সুযোগ যেন খর্বিত না হয়। সংবিধানে ১২৩ (৩) ক অন্তর্ভুক্তির পর অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনীর পর কোনো সংসদের মেয়াদ অবসান হতে পারেনি এবং’ সংসদ’ এবং ‘সরকার’ গঠনের বৈধতার প্রশ্নে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে পারেনি। সংবিধান যদি নিজেকে সুরক্ষার বা সংরোধক (Countervailing) ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তাহলে সে সংবিধানকে জীবন্ত বা ক্রিয়াশীল রাখা সম্ভব হবে না।

সংবিধান লঙ্ঘনের এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বন্ধের জন্য বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা এবং পর্যালোচনা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রে এখন এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে ধারাবাহিক সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করলে প্রশ্নটির সূরাহা মিলবে। কারণ আমরা সবাই স্বার্থসিদ্ধির কৌশলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

নিরপেক্ষ নির্বাচন বা ভোটাধিকার বা অন্যান্য বিষয়ে কথা বলা কোনো উদ্দেশ্য নয়, শুধু ধারাবাহিকভাবে সংবিধান লঙ্ঘনের প্রশ্নটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে প্রণীত পঞ্চদশ সংশোধনীর এই সাংঘর্ষিক অনুচ্ছেদ রহিত করে সংবিধানের ১৮তম সংশোধন আনায়ন করা এই সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয় তো সংসদ এবং সরকারের বৈধতার সংকটের কোনো নিরসন হবে না।

সংবিধান লঙ্ঘনে প্রজাতন্ত্রের সকল প্রতিষ্ঠান নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে গেলে সংবিধান মান্য করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে যাবে। সংসদের মেয়াদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সংসদ সদস্যদের শপথ ও সরকার গঠনের আইনগত জটিলতা অবসানে ১৮তম সংশোধনী আনয়নে শুধুমাত্র একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সংবিধানের ১৮তম সংশোধনীর প্রস্তাবনা :
বিদ্যমান সংবিধানের ১২৩ (৩) ‘ক’ এবং ‘খ’ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নরূপ অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)ক, এবং খ প্রতিস্থাপিত হইবে: ‘সংসদের মেয়াদ অবসান এবং ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ এই অনুচ্ছেদটুকু যুক্ত করলেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত সংবিধান লঙ্ঘনের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতার সমাপ্তি ঘটবে।

প্রজাতন্ত্র হিসাবে আমাদের উত্থানের ৫২ বছরেও আমরা রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক, নৈতিক ও মানবিক করতে পারিনি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক সুবিচার’- এর মহৎ আদর্শে আমরা রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। ইতোমধ্যে সংবিধান ১৭ বার সংশোধন হয়েছে- দলীয় এমনকি ব্যক্তি স্বার্থেও। এবার জাতীয় স্বার্থে ১৮তম সংশোধনী আনয়ন করা হোক।

লেখক : গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

Comments