ইমামের মাইকিং যেভাবে ঠেকিয়ে দিল আরেকটি দাঙ্গা

প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০১৮

এস আর :  ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রামনবমীর শোভাযাত্রার নামে তাণ্ডবে নিহত হয়েছে ১৬ বছরের ছেলে। বাবা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেরই আসানসোলের একটি মসজিদের ইমাম।

আসানসোলের যে অঞ্চলে মঙ্গলবার সন্ধ্যে থেকে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল সেই চাঁদমারি আর কুরেশী মহল্লা পেরিয়ে অনেকটা ভেতরে নূরানী মসজিদ। বৃহস্পতিবার খবর এলো, মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল রশিদি নিখোঁজ ছেলের লাশ পড়ে আছে স্থানীয় হাসপাতালে। তাঁকে বলা হলো হাসপাতালে গিয়ে লাশ সনাক্ত করতে।

ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল রশিদি হাসপাতালে গেলেন। সনাক্ত করলেন নিজের ছেলের ক্ষত-বিক্ষত লাশ। নখ উপড়ে নেয়া হয়েছে। ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের কোপ। লাশটি আধপোড়া, মনে হচ্ছে কেউ পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

আগের দুদিন ধরে নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজেছেন ইমদাদুল রশিদি । সেই সঙ্গে মহল্লার সব মানুষ। কোথাও পাওয়া যায়নি তাকে।

ক্ষত-বিক্ষত লাশটি যখন মহল্লায় আনা হলো, পরিস্থিতি হয়ে উঠলো আরও অগ্নিগর্ভ।

ইমাম সাহেবের ছেলের মৃত্যুর ঘটনাটা শুনে প্রথমে সবারই মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল বলে জানান মহল্লার বাসিন্দা মুহম্মদ ফারহাদ মালিক। তিনি বলেন “এটা তো রক্ত গরম করে দেওয়ার মতোই ঘটনা।”

ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল্লাহ বুঝতে পারলেন, এই প্রতিহিংসার রাশ টানতে হবে এখনই। নইলে আরও রক্ত ঝরবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রাণ যাবে আরও মানুষের। একটা মাইক হাতে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে সবার প্রতি আবেদন জানালেন, আপনারা শান্ত হোন।

ছেলের এই করুণ মৃত্যুর পরও শান্তির পথে অবিচল বাবা। প্রকাশ্য সমাবেশে মাওলানা ইমদাদুল রশিদি বলেছেন, যদি এ মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার কেউ চেষ্টা করে, তবে তিনি শহর ছেড়ে যাবেন।

মসজিদের ইমাম মাওলানা ইমদাদুল রশিদির ১৬ বছরের ছেলে সিবতুল্লা রশিদি নিখোঁজ হয় গত মঙ্গলবার। আসানসোলের রেইলপাড় এলাকা থেকে সাম্প্রদায়িক গোলযোগের সময় রাস্তা থেকে এক দল মানুষ ওই কিশোরকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন বুধবার গভীর রাতে তার লাশ পাওয়া যায়। আর পরিবারের লোকেরা বৃহস্পতিবার তার লাশ শনাক্ত করে। কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রশিদি বলেন, ‘ও (ছেলে) যখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, তখন গোলযোগ চলছিল। একদল দুষ্কৃতকারী ওকে তুলে নিয়ে যায়।

আমার বড় ছেলে পুলিশকে বিষয়টি জানায়। কিন্তু ওকে থানাতেই অপেক্ষা করতে হয়। পরে আমরা জানতে পারি, পুলিশ একটি লাশ উদ্ধার করেছে। সকালে ওকে আমরা শনাক্ত করি। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আসানসোলের ঈদগাহ ময়দানে নিহত সিবতুল্লাহর কবর দেওয়া হয়। সেখানে জড়ো হওয়া মানুষদের উদ্দেশে মাওলানা রশিদি বলেন, ‘আমি শান্তি চাই। আমার ছেলেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি চাই না কোনো পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারাক। আমি চাই না কারও বাড়ি পুড়ে যাক।’

ওই পাড়ায় হিন্দু আর মুসলমান পরিবারগুলো বহু বছর ধরেই যেমন একসঙ্গেই বাস করছেন, তেমনই সেখানকার মন্দির বা মসজিদ – সবই অক্ষত রয়েছে।

ওই মহুয়াডাঙ্গাল এলাকারই বাসিন্দা প্রমোদ বিশ্বকর্মা বলছিলেন, “ইমাম সাহেবকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব! ছেলে হারানোর পরেও রাস্তায় মাইক নিয়ে বলে বেরিয়েছেন যে সবাই যেন শান্তি বজায় রাখে। তবে আমাদের এই পাড়াতে আমরা হিন্দু আর মুসলমান সবাই একসঙ্গেই থাকি বহু যুগ ধরে। পাড়ায় একটা মন্দির আছে প্রায় দেড়শা বছরের পুরনো, আবার মসজিদও আছে। বাইরে যা হয় হোক, আমাদের পাড়ায় কেউ ঝামেলা করতে পারে না।”

জুলফিকার আলি দেখাচ্ছিলেন বহু যুগ ধরে মহুয়াডাঙ্গা এলাকায় কীভাবে হিন্দু আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশিই বাস করছেন।

আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম রশিদি বলেন, প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো চেষ্টা হলে আমি আসানসোল ছেড়ে যাব। আপনারা যদি আমাকে ভালোবাসেন, তবে একটি আঙুল ওঠাবেন না। ’ ছেলের করুণ মৃত্যুতেও নিজের দায়িত্বের কথা ভোলেননি মাওলানা রশিদি। মানুষের প্রতি, শান্তির প্রতি তাঁর আস্থার কথা বলেছেন।

মাওলানা রশিদি বলেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে আমি ইমামের দায়িত্ব পালন করছি। আমার দায়িত্ব মানুষকে সঠিক বার্তা দেওয়া। শান্তির বার্তা দেওয়া। আমাকে ব্যক্তিগত ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। আসানসোলের মানুষ এমন অন্যায় করতে পারে না। এটা একটি ষড়যন্ত্র। ’

আসানসোল পৌরসভার মেয়র জীতেন্দ্র তেওয়ারী বলেন, ‘ইমাম সাহেব উত্তেজিত যুবকদের শান্ত করেছেন। তিনি প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর জন্য আমরা গর্ব বোধ করি। সন্তান হারানোর মতো গভীর যন্ত্রণার পরও তিনি শান্তির আবেদন করেছেন। ’

আসানসোল পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার মোহাম্মদ নাসিম আনসারী বলেন, সদ্য সন্তান হারানো বাবার কাছে এমন কথা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা ভারতের জন্য তিনি একটি উদাহরণ। ’

আরেক বাসিন্দু কুন্দন যাদব দুধ বিক্রি করেন। তিনি বলছিলেন, “খালাসী মহল্লা, মুসদ্দি মহল্লা – সব জায়গাতেই দুধ দিতে গেছি। মঙ্গলবার দাঙ্গা বাধার পরেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল অনেকেই, বিশেষ করে কমবয়সী ছেলেরা। কিন্তু তারপরে তারাও নিশ্চিন্ত হয়েছে যে অন্য যেখানে যাই হোক না কেন.. আমাদের পাড়ায় কোনও গন্ডগোল হবে না। তাই এলাকা ছেড়ে কেউ যায়ও নি।”

/সূত্র : বিবিসি

Comments