ঘোরলাগা জীবনের বর্ষায় । অরোরা অর্নী

সকাল এগারোটা পাঁচ মিনিট।

আমি আর আম্মু লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে আছি। নানু বাড়ি থেকে ফিরছি। সামনেই শীতলক্ষ্যার ঘোলাজল। তিন চারদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সকালেও মুখরধারায় ঝরঝর বৃষ্টি ঝরেছে। আকাশ এখনো গম্ভীর। যে কোনো সময় আকাশের কান্না শুরু হতে পারে। নদী এখন পূর্র্ণযৌবনা। নদীর ঢেউ উচ্ছ্বাসে কলধ্বনিতে নৃত্যরত।

আম্মুকে বললাম, লঞ্চে যাব না। ট্রলারে নদী পার হয়ে অটো বা সিএনজি করে যাব। লঞ্চে আমার ভয় লাগে। শীতলক্ষ্যা আর ধলেশ্বরীর মোহনা এখন বিশাল জলরাশি। অদূরেই মেঘনার মোহনা। এই রুটে কখনো লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে এমনটা মনে পড়ে না। তবুও লঞ্চ একটু দুলে উঠলেই বুক কাঁপে। আম্মু কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। এত বড় মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে নিশ্চয়ই কিছুটা হতাশ হয়েছেন। আম্মুকে মানাতে পারছি না। তার কারণ হচ্ছে বৃষ্টির আশঙ্কা। ট্রলারে করে নদী পার হলে কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। ওপার দখল করেছে সিমেন্ট কারখানাগুলো।

ভেজাবালির পথটুকু হেঁটে পার হয়ে তারপর অটো বা সিএনজি করে মুক্তারপুর ব্রিজের ওপাড়ে গিয়ে রিকশা বা অটো করে বাসায়। আম্মু বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঝামেলায় যেতে রাজি না। লঞ্চে গেলে ঝামেলা কম। তাছাড়া বৃষ্টি নামলেও সমস্যা হবে না। ঘাট থেকে রিকশায় সোজা বাড়ির সামনে।

ঘাটের কিনারায় দাঁড়িয়ে জলযানের আনাগোনা দেখছি এমন সময় ছোটখাট একতলা একটা লঞ্চ এসে ঘাটে ভিড়েছে। আমরা এই লঞ্চে যাব না। মুন্সীগঞ্জে যাওয়ার লঞ্চ আসবে এগারোটা দশ মিনিটে। লঞ্চ থেকে অল্প কয়েকজন যাত্রী ঘাটে নামলো। সেই অল্প কয়েকজনের সঙ্গে কাঁচা জলপাই রঙা পাঞ্জাবি পায়জামা আর মাথায় সাদা টুপি পরিহিত এক লোক নামছে। লম্বা গড়ন, ফরসা গায়ের রং। মুখে অল্পবিস্তর দাড়ি। বয়স খুব বেশী হবে না, পঁচিশ থেকে ত্রিশের মধ্যে। সবাইকে ছাপিয়ে সেই লোকের উপর আমার দৃষ্টি আটকে আছে। লোকটিকে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। খুব কাছের কেউ। কোথাও কী দেখেছি তাকে? মনে করতে পারছি না। তিনি লঞ্চ থেকে নেমেছেন। হ্যাঁ, একাই নেমেছেন। তাঁর সঙ্গী কেউ নেই।

একদৃষ্টিতে লোকটিকে দেখছি। সচরাচর এমন হয় না। চলার পথে আশেপাশের প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হলেও মানুষ দেখে মুগ্ধ হওয়ার তেমন অভ্যেস আমার নেই। যে রিকশা দিয়ে ঘন্টাখানেক পথ যেতে হবে তার চালকের চেহারার দিকেও ভালোভাবে তাকাই না কখনো। রিকশা বিদায় করার একটু পরে যদি কেউ জিগ্যেস করে রিকশাচালকের পরনে কী রঙের জামা ছিল তা-ও বলতে পারি না। কিংবা যে ফুচকা বা আইস্ক্রিমওয়ালার কাছ থেকে দিনের পর দিন ফুচকা-আইস্ক্রিম কেনা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদেরকে নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত অন্য কোথাও দেখলে চিনতে পারি না।

একবার এমন হলো যে, রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি ভাংতি নেই। কয়েকটা দোকান ঘুরে ভাংতি এনেছি কিন্তু রিকশাওয়ালার ভাড়া মেটাতে পারছি না। কারণ যে রিকশা করে এসেছি তার চালকের চেহারা ভালো ভাবে খেয়াল করিনি। এখন কিছুতেই আর মনে করতে পারছি না। রিকশাওয়ালা যেখানে রিকশা ছিল সেখান থেকে রিকশা সরিয়ে পাশেই অন্য রিকশার সাথে নিজের রিকশা রাখাতে এই বিপত্তির সৃষ্টি। সে দুর্ভোগের কথা থাক। এমন ঘটনা একবার ঘটেনি, বেশ কয়েকবার এর সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এই মুহূর্তে মনে করার চেষ্টা করছি লঞ্চ থেকে নেমে আসা লোকটি কে বা কোথায় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মাথায় সুক্ষ্ম যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে। এই আমার আরেক সমস্যা। কোনো কিছু মনে থাকে না। ভুলে যাওয়া কিছু মনে করার চেষ্টা করলেই মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। লোকটির দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারছি না। তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেও কোন সমস্যা নেই। কারণ লোকটি বুঝতেই পারবে না কে তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বা কে ফিরেও তাকাচ্ছে না। মহান আল্লাহপাক তাঁকে সেই ক্ষমতা দেননি। লোকটি দৃষ্টিশক্তিহীন। তাঁর হাতে স্টিলের একটা ছড়ি। ছড়ির সাহায্যে সামনে এগিয়ে আসছেন তিনি। লোকটির চেহারা সুন্দর, চোখ দুটি আরো বেশি সুন্দর। হাতে ছড়ি না থাকলে বোঝার উপায় ছিল না যে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি ইন্দ্রিয় ঠিক ভাবে কাজ করে না।

আর তিন-চার পা এগিয়ে আসলেই লোকটি আমার মুখোমুখি হবে। চোখ বন্ধ করে ফেললাম। চোখ বন্ধ করে মনের করার বৃথা প্রচেষ্টা। লোকজন আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। মাঝখানে আমি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ করে মনে হলো সেই লোকটি আর এক পা সামনে এগিয়ে আসলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। একবার না, কয়েকবার মনে হলো। চোখ মেলে নিজের অজান্তেই সামনে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটি হুমড়ি খেয়ে পড়লো। নাহ্, নীচে পড়ে নি। নীচে পড়তে পড়তে তাঁর সামনের অন্ধকার পৃথিবী হাতড়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল এবং পেয়েও গেল। পড়ে যাওয়ার আগেই আমি তাঁকে ধরে ফেললাম কিংবা সে আমাকে।

লোকটিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করলাম। পাশ থেকে কয়েকজন যাত্রী সামনে এগিয়ে আসলেন। তাঁরা বলাবলি করছে সাবধানে পা ফেলবেন না! আরেকটু হলেই তো গেছিলেন। একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর লোকটি হাসতে লাগলেন। বোকা বোকা হাসি। বোঝাই যাচ্ছে পড়ে যাওয়ার জন্য তিনি লজ্জিত। হাসির মাধ্যমে নিজের লজ্জা কাটানোর চেষ্টা করছে। কে তাঁকে টেনে তুলল তা নিয়ে তিনি ভাবছেন বলে মনে হলো না। লোকটির জন্য অদ্ভুত মায়া অনুভব করছি। মন খানিকটা বিষণ্নও হচ্ছে। লোকটি হাসছে, আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাঁর হাসি দেখছি। মনে হচ্ছে এই মানুষটির ঠোঁটে এই বোকা ধরনের হাসিই সবচেয়ে বেশি মানানসই। এত সুন্দর করে হাসতে পারে যে মানুষ, যার চোখ এত সুন্দর সেই মানুষটির চোখে এই সুন্দর পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যের একটুও ধরা পড়ছে না। বর্ষার এই ভরা গাঙ, আষাঢ়ে বৃষ্টির কী অপরূপ সৌন্দর্য তা কি এই লোকটির জানা আছে?

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তাঁর জীবনে কখনো না কখনো নিজের রূপে মুগ্ধ হয়। এমন কি গাত্রবর্ণ কৃষ্ণ হলেও। এই লোকটি কি আয়নায় কখনো নিজের হাসিমুখ দেখেছেন? নাকি দৃষ্টিহীন হিসেবেই তাঁর মানবজন্ম শুরু হয়েছে? এই ভাবনাটাই কি এই মুহূর্তে আমার বিষণ্ণতার কারণ? কে জানে তিনি হয়তো পৃথিবীর আলাদা কোন সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত যে সৌন্দর্য কখনো আমাদের মতো দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের কাছে ধরা দেয় নি।

এখন আমি নিজেও হাসছি, যদিও নেকাবের আড়ালে আমার হাসি কেউ দেখছে না। আমি হাসছি কারণ আমার মনে পড়েছে লোকটি কে, তাঁর সাথে আমার কোথায় কীভাবে দেখা হয়েছিল। হ্যাঁ, তিনি আমার পরিচিত, খুব পরিচিত একজন। আমার ভালো লাগার একজন। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল দুই বছর একমাস আগে। তারপর এইতো দুই দিন আগে। দিন তারিখের হিসেব মনে রাখতে পেরেছি কারণ আজ সকালেও তাঁর সঙ্গে…

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় প্রায় দু বছর আগে। তিনি বান্ধবপুরের জুম্মাঘরের মাওলানা ইদরিস। যিনি পরবর্তীতে দেওবন্দ থেকে পরীক্ষায় পাশ করে হাফেজ টাইটেল নিয়ে আসেন। নবীজির সুন্নত মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার প্রচেষ্টায় থাকেন। ধর্মভেদ না করে মানুষের বিপদে আপদে সাহায্য করেন। গ্রামেরই শেষদিকে জঙ্গলের পাশে ঘর তুলে একা থাকেন। রাতে জ্বীন ভূতের ভয়ে আয়াতুল কুরসি পাঠ করতে করতে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফিরে ঘরে যা থাকে, চাল, ডাল, তেল, সব একসাথে দিয়ে খিচুড়ি বসান। খিচুড়ি রান্না হয়ে আসলে চুলা থেকে নামানোর আগে খিচুড়ির উপর এক চামচ ঘি ছড়িয়ে দেন। অপূর্ব সুঘ্রাণ ছড়ায়। খেতে স্বাদ হয় অমৃত।

অসুস্থতার সময় সুলেমানের তালাক দেয়া স্ত্রী জুলেখাকে মুখে তিনবার কবুল বলে বিয়ে করেন। এরপর কত ঘটনা। একসময় তাঁদের সংসার হয়। একটি কন্যা সন্তান হয়। এরপরও ঘটতে থাকে কত ঘটনা। জীবন ঘটনাবহুল। মানবজীবন ঘটনাবহুল।
হ্যাঁ, ঠিকই ভাবছেন। আমি বলছি ‘মধ্যাহ্ন’র মাওলানা ইদরিসের কথা। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’। বইটি পড়েছিলাম ২০১৭ এর জুন মাসে। উপহার পেয়েছিলাম। সেই জীবনের প্রথম বই উপহার। তা-ও অনেক দূরের অচেনা কারো কাছ থেকে পাওয়া উপহার। তাই তো একপ্রকারে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে দুই দিনে ওই পেটমোটা বইটি পড়ে শেষ করেছিলাম। এমনিতেও আমি তখন হুমায়ূন বলতে মন্ত্রমুগ্ধ! বইয়ের প্রতিটি চরিত্রকে ভালোবেসেছিলাম। পড়তে পড়তে খারাপ চরিত্রগুলোর প্রতিও কখনো না কখনো মায়া অনুভূত হয়েছে। দু’দিন আগে বইটা আবার পড়া শুরু করি। দুইদিনে আড়াইশো পৃষ্ঠা পড়া হয়েছে। মনে হচ্ছে এর আগে এই বই পড়িনি, এবারই প্রথম পড়ছি। যদিও বইয়ের সম্পূর্ণ কাহিনীই ভাসা ভাসা ভাবে আমার মনে আছে। খুব বেশি ভালো লাগলেও পাঠ্যবই ব্যতীত অন্য কোন বই একাধিকবার পড়ি না। হাতে গোনা কয়েকবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে।

আমার হাসি বিস্তৃত হচ্ছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে লোকটির মতোন বোকা টাইপের হাসি হাসছি। হাসছি কারণ আমার সামনের এই দৃষ্টিহীন মানুষটিকে আমার কিছু সময়ের জন্য মাওলানা ইদরিস মনে হয়েছিল। বুঝতেই পারিনি যে মাওলানা ইদরিস কোন রক্তমাংসে গড়া মানুষ না। তিনি একটা জড় বস্তুর ভেতরে লিপিবদ্ধ একটা চরিত্র মাত্র। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো দিন দেখা হয়নি। কোনো দিন দেখা হবে সেই সম্ভাবনাও নেই। অবশ্য কথাটা আংশিকভাবে সত্যি নয়, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে বইয়ের পাতায়। সেই পৃথিবীতে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সেখানেই তাঁর প্রতি আমার মায়ার জন্ম হয়েছিল। এখনো মনে হচ্ছে এই লোকটিই মাওলানা ইদরিস। এই লোকটিই যেন অবিকল মধ্যাহ্নে বর্ণিত সেই লোক। শুধু পার্থক্য এই যে এই লোকটি দৃষ্টিহীন আর মাওলানা ইদরিস ছিল দৃষ্টিসম্পন্ন। এই ভ্রান্তির কারণেই কি ঘাটে দেখা এই লোকটির প্রতি এত মমত্ববোধ হচ্ছে? একটা অচেনা অজানা মানুষকে এত আপন মনে হচ্ছে শুধুমাত্র একটা মিথ্যে চরিত্রের সাথে মিল পাওয়া গেছে বলে! একটি বইয়ের কতখানি গভীরে ডুব দেয়া যায়? গল্পের সঙ্গে কতখানি মিশে যেতে পারলে গল্পের একেকটি চরিত্রকে জীবন্ত মনে হয়? কতটুকু ঘোরের মধ্যে থাকলে আমাদের আশেপাশে আমরা সেই চরিত্রগুলোকে খুঁজে বেড়াই?

লোকটি তার হাতের ছড়ি নাড়াতে নাড়াতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। লঞ্চ এসে গেছে। এমএল রিয়া। আম্মু তাড়া দিলেন। পেছন ফিরে তাকাতে চেয়েও তাকালাম না। আম্মুর হাত ধরে লঞ্চে উঠছি। উপর তলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি। নদীতে ঢেউ তুলে লঞ্চ চলতে শুরু করেছে। ঢেউ দেখতে ভালো লাগছে। নদী কি কখনো ঢেউহীন স্থির হয়ে থাকে? মানুষের জীবনও তো নদীর মতোই বহমান। নদীর মতোই পরিবর্তনশীল, রহস্যময়। আম্মু পাশ থেকে জিগ্যেস করলো, কী ভাবছো?

‘কিছু না’ বললাম, আর ভাবলাম মানবজীবন সত্যিই রহস্যময়। বড়ই বিচিত্র। মায়া তার চেয়েও বেশি রহস্য সৃষ্টি করে।

লেখক : অরোরা অর্নী, কবি ও কথা সাহিত্যিক 

Comments