‘উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যাবে না একথা ইসলামে নেই’

মুফতি কাওছার বাঙ্গালী
আলেম, লেখক ও সংগঠক

আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের একটি বক্তব্যের জের ধরে মিডিয়াপাড়ায় চলছে তুমুল বিতর্ক। এর কোনো শেষ নেই। এমনকি খোদ আলেম সমাজের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে এ বিতর্ক।

যদিও এটা আলেম সমাজের মাঝে ছড়িয়ে পড়া কাম্য ছিলো না। কিন্তু স্বভাবগত দিক থেকে অনেকেই এ বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এদিকে এদেশের বামপাড়ার যত মিডিয়া এবং চিন্তাবিদ-সুশীল রয়েছেন, তারা সব সময় ইসলামের বিপক্ষে কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মত পোষণ করাকে তাদের অধিকার মনে করেন।

যদিও দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও অমানবিক বিষয়গুলোর প্রতি তাদের মতামত দরকার হওয়া সত্বেও সেক্ষেত্রে তারা বোবার ভুমিকা পালন করে থাকেন।

এখানে যে বিষয়টি আমি উল্লেখ করতে চাই সে বিষয়টা হচ্ছে, আল্লামা আহমদ শফী সাহেব একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। মেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষার নিশেধাজ্ঞাসূচক যে কথাটি তিনি বলেছেন, কথাটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেননি। কারণ ইসলামের কোথাও নেই মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না।

সেক্ষেত্রে আমরা যদি একটু বিচার বিশ্লেষণ করি দেখতে পাবো তিনি কেনো বলেছেন? ইসলামে যেখানে নারী শিক্ষার প্রসারের কথা বলা হয়েছে সেখানে তার এ কথা পুরোটাই বিরোধপূর্ণ।

আসল কথা তিনি ধর্মীয় মুরব্বী হয়েও এমনটা কেন বলেছেন! সেই যৌক্তিকতার জায়গায় যদি আসি, দেখতে পাবো অনেক কিছু। পবিত্র কুরআনে এক জায়গায় ‘নামাজের ধারে-কাছেও যেতে নিষেধ করা হয়েছে’।

অথচ ৮২ জায়গায় নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কুরআনেও তাহলে বৈপরিত্ব পাওয়া গেলো! অথচ বিষয়টি এমন নয়।

কুরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে নামাজের কাছে যেতে নিশেধ করা হয়েছে অন্য কারণে তা হচ্ছে ‘মাতাল অবস্থায়’ অনুরূপ ভাবে যিনি একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক। একটা বোর্ডের চেয়ারম্যান।

যার অধীনে লাখো মেয়েরা ধর্মীয় অঙ্গণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। তিনি তো এমন কথা বলতে পারেন না। তাই আগে বুঝতে হবে তাঁর বক্তব্যটি কি? যেটা পরবর্তীতে তিনিও ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন।

তিনি মূলত প্রচলিত সহশিক্ষা ব্যবস্থায় নিরাপত্তাহীন পরিবেশে নারীদের উচ্চ শিক্ষা নিতে বারণ করেছেন। সুতরাং আলোচনা-সমালোচনা যাই হোক সেটা বুঝে-শুনে করতে হবে।

তার বলার কারণ কি? তিনি একজন অত্যন্ত দরদী এবং এই বাংলাদেশের শতায়ু একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে, এদেশের মাটি, মানুষ, সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি; সব কিছুর দিকে সামঞ্জস্য রেখে নিরুপায় হয়ে এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।

একজন পিতা হিসেবে সমাজের অবক্ষয় ও ব্যর্থতা নিজ কাঁধে চেপেছেন। নির্যাতিতা, ধর্ষিতা-অবলার করুণ চিৎকার তিনি আর শোনার ধৈর্য রাখেন না তাই অসহাত্বের বোবা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।

কোনো পিতা-মাতা চয়না তার সামনে তার সন্তান নির্মমভাবে নির্যাতিত হোক। আমি নারীবাদী সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের উদ্দেশ্যে বলব- আপনারা আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের বক্তব্যের প্রতিবাদ করার পূর্বে, এদেশের শতকরা কত ভাগ নারী স্কুল-কলেজে যৌন-নিগ্রহের শিকার হচ্ছে এই পরিসংখ্যান আগে মিডিয়ায় তুলে ধরুন।

শতকরা ৭০ ভাগ নারী কোনো না কোনো ভাবে ইভটিজিং এবং যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। সুতরাং এর প্রতিকারের ব্যবস্থা কি আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা করতে পেরেছে? বরং দিন দিন নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ ও নারীর সম্ভ্রমহানী নিত্য- নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় আরো বেশি পরিমাণ বিস্তার লাভ করছে। সুতরাং তিনি একজন পিতা হিসেবে যেহেতু পড়ার সুষ্ঠপরিবেশ আমরা দিতে পারছি না তাই আমার মেয়ের আমি উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ঘরের বাইরে বের হলে সে নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে কিনা এই বিষয়ে আমি আশঙ্কাগ্রস্ত। সেক্ষেত্রে শিক্ষার জন্য আমার মেয়ের জীবন টাকে আমি পিতা হিসেবে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারি না।

এটা মুলতঃ বাস্তবায়নের জন্য নয় সমাজব্যবস্থাকে একটা ধাক্কা দেওয়ার জন্য। এজন্য আমাদের করণীয় নারীর উচ্চ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আর আমি আল্লামা আহমদ শফী সাহেবকে এই জন্য ধন্যবাদ জানাবো, উনি কথাটি এই কঠোরভাবে না বললে হয়তো বাংলাদেশের মানুষের ঘুম ভাঙতো না। মানুষের চেতনা জাগ্রত হত না। আজকের পক্ষে-বিপক্ষের তুমুল সমালোচনার মাঝে বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র নতুনভাবে উঠে এসেছে।

তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন এজন্য আমি আবারও তাকে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সেই সকল হলুদ মিডিয়ার প্রতি আমি আমার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই, যারা এই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার করেছে।

অন্যায়ভাবে আহমদ শফী সাহেব কে দায়ী করছে। বিশেষ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম যিনি, কথিত একটি ইসলাম দরদী সংগঠনের মহাসচিব এর দায়িত্ব পালন করছেন- কিন্তু আহমদ শফী সাহেবের কথায় তিনিও হতভাক এবং একরাশ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যা নিতান্তই হাস্যকর।

অপরদিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক আব্দুর রশিদ সাহেব তার বক্তব্যে আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের সাথে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। ওদিকে নিজস্ব স্বভাব এবং দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ সাহেবও আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের বক্তব্যের বিরোধিতা করে মত পোষণ করেছেন।

আসলে এগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক। অন্তত ইসলামী অঙ্গনের আমাদের সকলের চিন্তার ঐক্য থাকা দরকার।

সবার উচিৎ সকলে মিলে আমাদের দেশ, সমাজ,জাতি এবং আমাদেরকে নারীদের আরো এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা থাকা। সর্বশেষ শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা চাই। ধন্যবাদ।

/এসএস

Comments