সুদানে মোসাদ পরিচালিত ‘রিসোর্ট’ এর সন্ধান

প্রকাশিত: ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সুদানের মরুভূমির মধ্যে লোহিত সাগরের তীরের ছোট্ট একটি পর্যটন গ্রাম; নাম অ্যারোস। সেখানে তৈরি করা হয় মনোমুগ্ধকর একটি রিসোর্ট। ডাইভিং আর মরুভূমিতে আনন্দ করার নানা উপকরণ ছিল সেখানে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের জানা নেই, এই রিসোর্টটি আসলে ইসরায়েলি গুপ্তচরদের একটি কেন্দ্র।

রিসোর্টের বিজ্ঞাপনে সাগরের তীরে চমৎকার সাজানো সৈকতের পাশাপাশি যুগলের স্কুবা করার বা মাছ ধরার ছবি। বিলবোর্ডে বড় করে লেখা রয়েছে, “এখান থেকে স্বর্গের দেখা মেলে”। ইউরোপের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে এখানে বুকিং দেয়া যায়। একই সঙ্গে একহাজার অতিথি এখানে বাস করতে পারেন।

সুদান সরকারের কাছ থেকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীর একটি দল এই জায়গাটি লিজ নিয়ে রিসোর্টটি গড়ে তোলে। যেখানে প্রায়ই বিদেশি অতিথিরা বেড়াতেও আসেন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই আসলে সাজানো। এটি আসলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাডের একটি ফ্রন্ট বেজ।


এই বিজ্ঞাপন দিয়েই বিশ্বের পর্যটকদের আকষর্ণ করা হতো অ্যারোসে

আশির দশকের প্রথমদিকে মোসাডের এজেন্টরা এই রিসোর্টটি গড়ে তোলে। এটি ছিল তাদের একটি মানবিক মিশনের অংশ। সুদানের শরণার্থী শিবির গুলোয় যে হাজার হাজার ইথিওপিয়ান ইহুদি আটকে পড়ে ছিল, তাদের উদ্ধার করে ইসরায়েল নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। ইথিওপিয়ার ইহুদিরা ‘বেটা ইসরায়েল’ গোত্রের সদস্য, যাদের সত্যিকারের অতীত পরিচয় এখনো অজানা।

সে সময় এই রিসোর্টে কাজ করা একজন এজেন্ট গ্যাড শিমরন বলছেন, ”এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় গোপন ব্যাপার, কেউ এ নিয়ে কথা বলতো না। এমনকি আমার পরিবারও এ বিষয়ে কিছু জানতো না।”

ইথিওপিয়ানদের ব্যাপারে অনেকে মনে করেন, তারা প্রাচীন ইসরায়েলের তথাকথিত হারিয়ে যাওয়া ১০টি গোত্রের একটি। অথবা কুইন অব শেবা এবং কিং সলোমনের একটি পুত্রের বংশধর, যিনি ইথিওপিয়ায় ফিরে গিয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, তারা ৫৮৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে ইথিওপিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। একসময় তারা সারা বিশ্বের ইহুদিদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং তারা মনে করতেন, তারাই বিশ্বের একমাত্র জীবিত ইহুদি।

১৯৭৭ সালে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে অন্য অনেক অ-ইহুদির সঙ্গে তাদের একজন ইহুদি সদস্য ‘ফ্রেরেডে আকলুম’ সীমান্ত অতিক্রম করে সুদানে আসেন। ফ্রেরেডে আকলুম মুক্ত জীবন পেয়ে আটক ভাইদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেন এবং  শরণার্থী সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি লেখেন। এর একটি চিঠি মোসাডের হাতে পড়ে। তখনকার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন মোসাডকে আদেশ দেন এই ইহুদিদের বের করে ইসরায়েলে নিয়ে আসার। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসরায়েল-ই হলো সব ইহুদির আশ্রয়কেন্দ্র।

ফ্রেরেডে আকলুম ও তার বন্ধুরা

ফ্রেরেডে আকলুমের মাধ্যমে ইথিওপিয়ার ইহুদিদের কাছে বার্তা পাঠানো হয় যে, জেরুজালেমে যাওয়ার একটি ভালো উপায় রয়েছে। ফলে হাজার হাজার ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ২৭০০ বছরের পুরনো স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি হলো। এরপর মুক্ত জীবন পাওয়ার আশায় প্রায় ১৪ হাজার বেটা ইসরায়েলি পায়ে হেটে ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সুদানে আসেন। এই পথে আসতে গিয়ে ১৫০০ মানুষ মারা যায়।

তখনকার মুসলিম প্রধান সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলের ছিল বৈরি সম্পর্ক। যেহেতু দেশটিতে ইহুদিদের বসবাস নেই এবং মুসলমানগণ ইহুদি বিরোধী, তাই এদের বলা হয় তারা যেন সুদানি কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের ধর্ম পরিচয় প্রকাশ না করেন। যাতে সবাই নিরাপদে ইসরায়েলে পৌঁছতে পারে।

উদ্ধার অভিযান

এই ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ইসরায়েলে নিয়ে আসতে হলে লোহিত সাগর পাড়ি দিতে হবে। এজন্য ইসরায়েলি নেভির সহায়তা চান মোসাড এজেন্টরা। মোসাডকে নেভিরা সহায়তা করতে রাজি হয়ে যায়। পরে মোসাডের কয়েকজন এজেন্ট লোহিত সাগরের তীরে গিয়ে একটি সুবিধামত জায়গা খুঁজে বের করেন।


এরকম ছোট ছোট নৌকায় করেই ইহুদি শরণার্থীদের সুদান থেকে বের করে নিয়ে যেতে জ্যাড শিমরন

ইটালিয়ান ব্যবসায়ীরা ১৯৭২ সালে সেখানে ১৫টি বাংলো তৈরি করেন। বাংলোতে একটি রান্নাঘর ও বড় একটি খাবারের ঘর তৈরি করা হয়। সেটিকেই পরবর্তীতে মনোমুগ্ধকর রিসোর্টের রূপ দেয়া হয়। কিন্তু পানি আর বিদ্যুতের অভাবে রিসোর্টটি পর্যটকদের জন্য চালু করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে মোসাডের কয়েকজন এজেন্ট রিসোর্টটি পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তুলেন। যার ফলে মানুষজনের যাতায়াত শুরু হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এজেন্ট বলে, ”এটা খুবই দুর্গম একটি জায়গা। মোসাড পেছনে না থাকলে সেটি চালানোও সম্ভব হতো না।”

ভুয়া পাসপোর্টে সুইস অপারেটিং কোম্পানির ছদ্ম পরিচয়ে একদল মোসাড এজেন্ট সুদান সরকারের কাছে গিয়ে এই গ্রামটি লিজ নেয়ার প্রস্তাব করেন এবং তিনবছরের জন্য প্রায় সোয়া তিন লাখ ডলারের বিনিময়ে ভাড়া নেন।


ইথিওপিয়ার ইহুদিরা, ১৯৮৩ সালের ছবি

প্রথম বছর জুড়ে তারা পুরো গ্রামটি নতুন করে তৈরি করে। তবে বিশুদ্ধ পানি আর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের একটি ঝামেলাও হয়। শর্ত মেনে তার সাথে একটা চুক্তিতে আসে মোসাড এজেন্টরা। পরে সেখানে স্থানীয় ১৫জনকে চালক, পাচক, ওয়েটার ইত্যাদি পদে চাকরি দেয়া হয়, যাদের বেতন নির্ধারিত করা হয়েছিল দ্বিগুণ। কিন্তু এই কর্মীরাও জানতো না রিসোর্টের আসল পরিচয় বা তাদের ম্যানেজার একজন মোসাড এজেন্ট। দিনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নারী এজেন্টদের নিয়োগ করা হয়েছিল, যাতে সন্দেহ তৈরি না হয়।

এই রিসোর্ট গড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইথিওপিয়ান ইহুদিদের বের করে নিয়ে আসা। ”রাতের বেলায় এজেন্টরা গিয়ে ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ছোট ছোট দলকে এই রিসোর্টে নিয়ে আসতো। বের করে নিয়ে আসার জন্য তাদের আগ থেকে কোনো তথ্যই জানানো হতো না। তারাও জানতো না আমরা ইসরায়েলি এজেন্ট। তাদের বলতাম, আমরা ভাড়াটে সৈনিক।” বলছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মোসাড এজেন্ট।

ট্রাকে করে তাদের এই রিসোর্টের উত্তর প্রান্তে নিয়ে আসার পর ইসরায়েলি নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী আর সিল সদস্যরা ছোট নৌকা করে দেড় ঘণ্টা দূরের জাহাজে নিয়ে যেতো। সেখান থেকে লোহিত সাগরের মাঝ দিয়ে তাদের ইসরায়েলে পৌঁছে দেয়া হতো।


ইসরায়েলি একটি জাহাজে খাবার খাচ্ছে সুদান থেকে সদ্য বের করে আনা ইথিওপিয়ার ইহুদিরা

১৯৮২ সালের মার্চে তাদের তৃতীয় অভিযানটি ধরে ফেলে সুদানের সেনা সদস্যরা। তাদের সঙ্গে গোলাগুলিও হয়। কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। তারপর থেকে সাগর পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়। তার বদলে সাগরের মাঝে একটি সুবিধাজনক বিমান অবতরণ ক্ষেত্র খুঁজে বের করে এজেন্টরা। সেখান থেকে হারকিউলিস বিমানে করে শরণার্থীদের ইসরায়েলে নিয়ে আসা হতো।

এতো কিছুর পরেও ওই রিসোর্টটি পরিচালনা অব্যাহত রাখে মোসাড এজেন্টরা। সেখানে বেড়াতে গেছে মিশরের সেনাবাহিনী, ব্রিটিশ এসএএস সৈন্যরা, সুদানি আর ব্রিটিশ কূটনীতিকরা-কিন্তু তাদের কেউ জানতো না এর পরিচালকদের আসল পরিচয়।

তবে সুদান থেকে শরণার্থীদের বিমান করে বের করে আনার এই খবরটি ১৯৮৫ সালের ৫ই জানুয়ারি বিশ্বের সংবাদপত্রগুলোয় প্রকাশিত হয়। এরপর সুদানিজ সরকার বিমান অভিযান বন্ধ করে দেয়। তারপরও রিসোর্টটি পরিচালনা অব্যাহত রাখে মোসাড। যদিও তখন আর তাদের এর পেছনে কোন খরচ করতে হতো না, কারণ পর্যটকদের কাছ থেকেই পর্যাপ্ত মুনাফা আসতো।

কিন্তু ১৯৮৫ সালের ৫ই এপ্রিল সুদানে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রিসোর্ট থেকে মোসাড এজেন্টদের চলে আসার নির্দেশ দেন এর প্রধান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্ট বলছেন. ”এক রাতেই আমাদের ছয়জন সদস্য সেখান থেকে চলে আসি। তখনো রিসোর্টে অনেক পর্যটক ছিলেন। কিন্তু তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, স্থানীয় কর্মীরা রয়েছে। ডাইভিং ইন্সট্রাকটরসহ নারী ম্যানেজার এবং বাকী কর্মীর সবাই লাপাত্তা হয়ে গেছে।”

এরপর থেকেই রিসোর্টটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

সূত্র: বিবিসি/এসআর

Comments